লন্ডন থেকে বিমান

আমার ছেলে লন্ডনে পড়ে। লম্বা এক ছুটিতে দেশে আসবে বলে এমিরেটসের টিকেট কিনেছিল।
এক মাস আগে মোবাইল হারিয়েছে। মোবাইল ছাড়াও যে ভাল থাকা যায় তা প্রমান করার জন্য আর কোন ফোন কিনে নাই। সমস্ত যোগাযোগ নোটবুকের আই-মেসেজ দিয়ে চালাচ্ছিল।
রাত দশটার ফ্লাইট, কিন্তু হিথ্রোতে এসে ফ্লাইট মিস করলো। গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠিয়ে আমাদের জানালো এটা। 
পরবর্তী তিন দিন পর্যন্ত এমিরেটসের কোন সিট পাওয়া যাবে না। তার ক্রেডিট কার্ডে অল্প কিছু পাউন্ড আছে মাত্র। হোস্টেলের রুম একেবারে ফেরত দিয়ে এসেছে, ওখানেও যেতে পারবে না। যখন আমার সাথে কথা বলছিল ও তখন ক্লান্ত বিধ্বস্ত ও লজ্জিত।
এদিকে অনেক খোঁজাখুঁজির পর আমি বাংলাদেশ বিমানের একটা সীট পেলাম। আমাদের কাছে বিমান সাধারণত প্রথম পছন্দের ক্যারিয়ার হয় না। রাতেই টিকেটটা মেইলে পাঠিয়ে দিলাম। কিন্তু ফ্লাইট ছাড়ার সময় ২৪ ঘন্টা পর। এই পুরো সময় ছেলেকে লাউঞ্জে লবিতে শুয়ে বসে কাটাতে হবে।
টিকিটটা হাতে পেয়ে ছেলে তখন অনেক নির্ভার ও নিশ্চিন্ত। সারাক্ষণ আমাদের সাথে কথা বলছে, ম্যাসেজ দিচ্ছে নিচ্ছে। উৎফুল্ল।
অথচ আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছ থেকে ছেড়ে যায়নি। পরদিন রাতে ফ্লাইট টাইমের তখনো ৩ ঘন্টা বাকী – হঠাত ছেলের সাথে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। আমরা বুঝতে পারছিলাম না ও কি কোথাও ঘুমিয়ে পড়েছে? কিংবা তার হাতের ব্যাগ বা নোটবুক চুরি হয়ে গেছে? নাকি চার্জ শেষ হয়ে গেছে? নাকি অন্য কিছু?
বোর্ডিং হোল কিনা দেখার জন্য অনলাইন চেকইন সার্চ করলাম, কিছুই পেলাম না।
সব যখন ব্যার্থ তখন গুগুলে সার্চ করে বাংলাদেশ বিমানের হিথরো পয়েন্টের দুইটা মোবাইল নাম্বার পেলাম।
এবং তার মা তক্ষুনি একটা নাম্বার ধরে কল করলো।
চার পাঁচটি রিং হবার পর কল ধরলেন বিমানের অপারেশন ম্যানেজার, মি সেলিম। কোন ভুমিকা না করে তার মা বলল ……একটু হেল্প করবেন, প্লিজ … আমার ছেলে কি বোর্ডিং করেছে।
উনি তখন এয়ারক্রাফটের ভিতরে, খুবই ব্যাস্ত । ভালভাবে কথা শুনা যায় না। কথা বলার সময় কোন রেফারেন্স বা পরিচয় ব্যবহার করে নাই। একজন সাধারণ প্যাসেঞ্জারের জন্য সাহায্য চাওয়ার মতন করে কথা বলছিল।
সেলিম সাহেব ছেলের নাম ধাম সব শুনে আমি দেখছি বলে লাইনটা কেটে দিলেন।
আমরা ভীষণ অস্থির হয়ে রইলাম। অপেক্ষা ছাড়া তখন আর কিছু করার নেই। প্রতিটা মুহূর্ত মনে হচ্ছিল একেকটা ঘণ্টা।
আধ ঘন্টা পর হটাত একটা কল পেলাম। লন্ডন থেকে মি সেলিম কল করেছেন।
হ্যালো, আপনার ছেলে এখন প্লেনে তার সীটে বসে আছে, ধরুন কথা বলুন। ছেলে ফোন হাতে নিয়ে বলল মা আমি ভাল আছি।
মুহূর্তের মাঝে আমাদের সব উদ্বিগ্নতা ও অনিশ্চয়তা কেটে গেল।
কিন্তু বিস্ময় কাটলো না।
যে সার্ভিস পেলাম এটা কি? এটা কোন এভিয়েশন ম্যনুয়েলে লেখা নেই নিশ্চয়।
বুঝলাম সার্ভিসের এই স্টাইলটা একেবারেই বাংলাদেশের।

২৮ জুন, ২০১৭